টেলিকম খাত পুনর্গঠনে গেজেট প্রকাশ, মধ্যস্বত্বভোগী লাইসেন্স বাতিল

ডেক্স নিউজ: অকার্যকর, টেলিযোগাযোগ সেবাখাত বিকাশের অন্তরায়, আওয়ামী মাফিয়াতান্ত্রিক লাইসেন্স যুগকে বাতিল করতে নতুন টেলিকম লাইসেন্স বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং ২০২৫’ পলিসি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দেওয়া বৈধ ও অবৈধ তিন হাজারের বেশি লাইসেন্স রিভিউয়ের আওতায় আনা যাবে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ জসীম উদ্দিসের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন লাইসেন্সগুলোর ফি, রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের যে গাইডলাইনটি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি খসড়া। এটি অংশীজন ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আরও আলাপ-আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। নতুন লাইসেন্স পলিসিতে ইন্টারনেটের দাম বাড়ে—এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।

পুরানো লাইসেন্স ব্যবস্থা অ্যাকসেস টু ইন্টারনেট, অ্যাক্সেস টু ডিভাইস এবং অ্যাক্সেস টু ফাইবার—এই তিন ক্ষেত্রের কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে, ব্যাবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ফাইবার পৌঁছেনি, মোবাইল টাওয়ারে ফাইবার (২২ শতাংশ মাত্র) সেভাবে পৌঁছেনি। যেহেতু ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ হয়নি, তাই ডেটা ব্যবহারের ভলিউম ভারতের তুলনায় মাথাপিছু হিসাবে ৫০ ভাগের ১ ভাগেই রয়ে গেছে।

পুরোনো লাইসেন্স নীতিতে টেলিযোগাযোগ শিল্প এখনো ‘কানেকশন-কেন্দ্রিক’ থেকে গেছে। অথচ বিশ্ব টেলিকম খাত ইতোমধ্যে ডিজিটাল সার্ভিস-ভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের টেলিকম পণ্যের সিংহভাগ এখনো মোবাইল বান্ডেল ও আইএসপি প্যাকেজনির্ভর। কিন্তু দেশে এডটেক, হেলথটেক, এগ্রিটেক, ফিনটেক, লজিস্টিক্স টেকসহ স্টার্টআপভিত্তিক ডিজিটাল সেবা এখনও গড়ে ওঠেনি, যা নতুন নীতির মাধ্যমে উৎসাহিত করা হবে।

আইএসপি, মোবাইল ইন্টারনেট, এনটিটিএন কিংবা আইআইজি—কোনো খাতেই এখনো কোয়ালিটি অব সার্ভিস (QoS)-ভিত্তিক ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নিরাপদ ইন্টারনেট (সিকিউর ইন্টারনেট) ধারণাও দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অধিকাংশ আইএসপি ও মোবাইল অপারেটরের সেবা অনিরাপদ; প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার সিকিউরিটি মডিউল, প্যাম, সাইবার নিরাপত্তা সফটওয়্যার, ফায়ারওয়াল ইত্যাদি সঠিকভাবে ব্যবহার হয়নি। ফলে ব্যবসা অনিরাপদ পদ্ধতিতে এগিয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি সম্প্রসারণে ২৬ ধরনের লাইসেন্স ব্যবস্থা বাতিল করে সহজ ও সমন্বিত (কনভার্জড) লাইসেন্স চালুর বিকল্প নেই বলে জানায় মন্ত্রণালয়। তবে দেশীয় বাস্তবতা ও একচেটিয়া প্রবণতার ঝুঁকি বিবেচনায় ‘সবাই সবকিছু করতে পারবে’—এমন পূর্ণাঙ্গ একীভূতকরণে না গিয়ে ৪ স্তরের লাইসেন্স কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে একদিকে প্রতিযোগিতা বাড়বে, অন্যদিকে প্রতিটি স্তরের কার্যপরিধি আরও সম্প্রসারিত হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ৭ স্তরের লাইসেন্স ব্যবস্থা রেখে তার ৬ স্তর একক কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার মতো দুর্বৃত্তায়ন থেকে টেলিকম খাতকে রক্ষা করতেই নতুন লাইসেন্স নীতি অপরিহার্য ছিল। নতুন নীতিতে লাইসেন্সিংয়ের স্তরায়ন কমিয়ে আনা হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগী কমে এবং প্রতিযোগিতামূলক সেবা নিশ্চিত হয়। এতে সরকারের রাজস্ব কমানো ছাড়াই গ্রাহকদের কাছে সুলভ মূল্যে সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

আগের লাইসেন্স কাঠামোতে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেই টোল সংগ্রহের সুযোগ ছিল। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান রেন্ট-সিকিং প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ে—যেখানে ৯০ শতাংশ রেভিনিউ শেয়ারিং দিলেও তাদের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল না, কিন্তু ৪৫-৫০ শতাংশ রেভেনিউ শেয়ার করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা তুলে নেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিতে এ ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী লাইসেন্স সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়েছে।

একদিকে শুল্ক কাঠামো সহনীয় রাখায় রাজস্ব সংগ্রহে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত স্তরযুক্ত মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামো অপসারণ করা না গেলে ইন্টারনেটের দাম প্রত্যাশিতভাবে কমানো সম্ভব নয়। তবে নতুন QoS প্রতিবেদনে ইন্টারনেটের গতি ও মান বৃদ্ধির প্রমাণ মিলেছে।

নতুন নীতিতে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের নতুন লাইসেন্স দেওয়া হবে, যাতে তারা নতুন বিনিয়োগসহ ব্যবসা অব্যাহত রাখতে পারেন। এ ছাড়া আইজিডব্লিউ ও আইসিএক্স লাইসেন্সগুলোর আবেদন কার্যত শেষ হয়ে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির জীবনচক্রও প্রায় শেষ। তাই এসব ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ না করে উদীয়মান প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করাই যৌক্তিক বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

নতুন নীতিতে এনটিটিএনদের ৩৫ শতাংশ, আইসিএসপিদের ৫১ শতাংশ এবং এমএনওদের ১৫ শতাংশ শেয়ার—জয়েন্ট ভেঞ্চার, শেয়ার হস্তান্তর বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে—দেশীয় উদ্যোক্তাদের অনুকূলে ছাড়তে হবে। পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তারা চাইলে ১০০ শতাংশ মালিকানায় ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগও পাবেন।

এ ছাড়া প্রাইভেট ৫জি ও এমভিএনও ব্যবসা পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হয়েছে, যেখানে দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।

সার্বিকভাবে, নতুন নীতিতে কোনো প্রযুক্তিগত বাধা রাখা হয়নি। ফলে অনুপযুক্ত খাতে অকার্যকর বিনিয়োগের পরিবর্তে নতুন ধারার টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি ও নতুন ডিজিটাল সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com