ডিউটি ফ্রী সুতা বিক্রি হচ্ছে খোলা বাজারে মামুন এন্ড ব্রাদার্স সিন্ডিকেটের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেড় যুগের বেশি সময় ধরে বন্ড সুবিধা ব্যবহার করে পোশাক তৈরির শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করছে এবং অন্যান্য বন্ড লাইসেন্সের আমদানিকৃত সুতা ক্রয় বিক্রয় করে নারায়নগঞ্জের সুতা মাফিয়া মামুন এন্ড ব্রাদার্স হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। এই সিন্ডিকেট প্রধান হাজী তোতা মিয়া তার ছেলে মামুন এবং তার অন্য চার ভাই। বন্ড সুতা সিন্ডিকেটের সাথে এই পরিবারের সকল সদস্য জড়িত। ইতোমধ্যে মামুন ও তার ভাই সালাউদ্দিন সহ কয়েকজন গ্রেফতার হলেও বিপুল অর্থের বিনিময়ে সেই সকল মামলা দফারফা হয়। এছাড়া এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) সুবিধার আওতায় নিজেদের পরিশোধিত মূল্যে বিদেশি ক্রেতারা যেসব কাঁচামাল বা কাপড় পাঠাতেন, তাও বিক্রি করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে এই চক্র। অর্থপাচারসহ বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০০০ সাল থেকে মামুন এন্ড ব্রাদার্স এমন জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিষয়টি শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে ধরা পড়েছে।

কাস্টমসের একটি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করাসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স বাতিল হওয়াসহ বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে বন্ডের বিপরীতে জামানত থাকা ৩০ লাখ টাকা। গ্রেপ্তার ছাড়াও অর্থদণ্ড-কারাদণ্ডের মতো শাস্তির মখোমুখিও হতে পারেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠানের জড়িত কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের এসব শীর্ষ কর্মকর্তারা দৈনিক ভয়েস নিউজের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বন্ডের সুবিধায় এ পর্যন্ত আনা কয়েক হাজার কোটি টাকার শুল্কমুক্ত রপ্তানিকৃত পোশাক তৈরির কাঁচামাল দেশে এনে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের সহায়তায় খালাসের পর হাওয়া করে দেওয়ার বিষয়ে কথা বলতে অনিহা প্রকাশ করেন।

তবে কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, পোশাক রপ্তানিকারক ‘মামুন এন্ড ব্রাদার্স এ পর্যন্ত কত পরিমাণ কাঁচামাল ও কাপড় বিদেশ থেকে এনেছেন, অন্যান্য বন্ড লাইসেন্সধারীদের নিকট থেকে কি পরিমাণ সুতা কালোবাজারি করেছেন —তা জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।কর্মকর্তারা জানান, বন্ড সুবিধায় যে কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওই পরিমাণ তৈরি পোশাক সংশ্লিষ্ট দেশে রপ্তানির নিয়ম রয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিকে বিদেশি বায়াররা এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) সুবিধার আওতায় নিজেরা মূল্য পরিশোধ করে যেসব কাপড় পাঠিয়েছেন, তার বিপরীতে কি পরিমাণ পোশাক ওইসব কোম্পানিকে পাঠিয়েছে- তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

মামুন এন্ড ব্রাদার্স এর অনিয়ম অডিট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দৈনিক ভয়েস নিউজ কে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির আমাদানি ও রপ্তানিকৃত পোশাকের যে অসাঞ্জস্যতা ধরা পড়েছে, এসব বেআইনি কর্মকাণ্ড থেকে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এর বাইরেও এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে আরও কারা জড়িত, কে কে এর মাস্টারমাইন্ড- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির লেনদেনসহ সব কার্যক্রম নজরদারি করা হচ্ছে বলেও জানায় কাস্টমস সূত্র।

আর ঢাকার কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের প্রধান, কমিশনার মোহাম্মদ আহসানুল হক পুঙ্খানুরূপে তদন্তের মাধ্যমে মামুন এন্ড ব্রাদার্স ও এর কর্ণধারদের শাস্তির আওতায় আনার কথা জানান। এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতির কথাও বলেন কমিশনার আহসানুল। রপ্তানি পোশাক শিল্পের বন্ড সুবিধার আড়ালে শত কোটি টাকা দূর্নীতি অনিয়মের সামনে এলে আমাদের ইনভেস্টিগেশন টিম তদন্ত শুরু করে।কাগজে-কলমে ভয়েস নিউজ টিম যে পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম পেয়েছেন, তার কয়েকগুন টাকা প্রতিষ্ঠানটি লোপাট করেছে। সরকার হাজার কোটি রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থপাচারসহ বিদেশের বায়ারদের কাছে দেশের পোশাক খাতের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং দেশের সুতার কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা রপ্তানিকৃত পোশাক তৈরির কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে অথচ এই তোতা মিয়া ২০০০ সালের দিকে খাদ্য সংকটে ভুগছে বাই সাইকেল দিয়ে চলাচল করতো। এখন সেই তোতা মিয়া হঠাং আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বিভিন্ন মহল ম্যানেজ করে সে তার অবৈধ ট্যাক্স ফাঁকির ব্যবসা চালিয়ে গেছে। আমাদের ইনভেস্টিগেশন টিমের অনুসন্ধানে তার অবৈধ সম্পদের সংক্ষিপ্ত ফিরিস্তি তুলে ধরা হলোঃ

অবৈধ সুতার গুদামের সংখ্যা ৭৬টি অধিক। মধাবদী ১৪টি, বন্দর রুপালি গুদামঘরের সংখ্যা ৯টি, বিসিক নারায়ণগঞ্জ ১টি, শাহাপাড়ায় ২৭টি, টানবাজার ২২টি, শাহাপাড়ায় নিজ বাসভবনে ৩টি। এই ৭৬টি গুদামের হাজার হাজার কোটি টাকার বন্ডের সুতা গুদাম জাত রয়েছে। এবং তার বিভিন্ন ব্যাংকে একাউন্টে হাজার হাজার কোটি টাকা রয়েছে। তার প্রাইভেট কারের সংখ্যা ২২টি, কাভার ভ্যানের সংখ্যা ১৮টি, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের সামনে ৫২ শতাংশ জায়গা এবং শাহাপাড়ায় বাড়ির সংখ্যা ১১টি, এবং ফ্ল্যাট ৪২টি, মাদারীপুর বাহাদুরপুর এলাকায় ৪৩ ও ৫৮ শতাংশ মোট ১০১ শতাংশ জায়গা এবং বিভিন্ন জায়গায় নামে বেনামে পরিবারের সদস্যদের নামে অগনিত স্থাবর অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার মোহাম্মদ আহসানুল হক ঢাকা ভয়েস নিউজকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে পরবর্তী আইনি পক্রিয়া চলমান। বন্ড সুবিধার নামে জালিয়াতি বা যে কোনো ধরনের অনিয়মের বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।’ আইনানুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ও কর্তৃপক্ষের বিরদ্ধে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান এই কাস্টমস কমিশনার।

এদিকে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, এমডি মামুনকে ফোনকল ও খুদে বার্তা এবং হোয়াটস বার্তা পাঠিয়ে এ বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হলে তারা এড়িয়ে যান। হোয়াটস বার্তা সিন করলেও উত্তর দেননি।

একপর্যায়ে এই জালিয়াতির বিষয়ে মামুন এন্ড ব্রাদার্স কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমে মন্তব্য করবেন না বলে ইঙ্গিত দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com