জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬: প্রচার- প্রচারণায় নতুন মাত্রা‘ক্রাউডফান্ডিংয়ের’ আবেদন

মনির হোসেন জীবন / নাসির উদ্দিন বুলবুল : দেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬কে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং প্রচার- প্রচারণায় নতুন করে নতুন এক মাত্রা যোগ হয়েছে। দেশের নামি-দামি শিল্পপতি, কোটিপতি কিংবা দাতা গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে অনেক প্রার্থী এখন দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা কিংবা ‘ক্রাউডফান্ডিং’-এর আবেদন জানাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

প্রার্থীরা দাবি করছেন, এই পদ্ধতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সাথে তাদের সরাসরি সংযোগ তৈরি হচ্ছে। মনোনয়ন কেনার চেয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানে নির্বাচন করা অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং এতে জনগণের কাছে জবাবদিহি বজায় থাকে।

নির্বাচনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, সংসদীয় ঢাকা ১২ আসনের প্রার্থী ও আমজনতার দলের সদস্য সচিব তারেক রহমান, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ, বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ ও মুলাদী) আসনের প্রার্থী ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বরিশাল ৫ (সদর) আসনের প্রার্থী ও বাসদের জেলা সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থীরা যদি অনলাইনে প্রচারণা বা অর্থ সংগ্রহ করতে চান, তবে তাদের ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া পেজ বা অ্যাকাউন্টের তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে আগেভাগে জানাতে হবে। সংগৃহীত অর্থ প্রার্থীর নির্ধারিত নির্বাচনি ব্যয়ের সীমার মধ্যেই থাকতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে ডিজিটাল মাধ্যমে অপপ্রচার ও অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহার রোধে ইসি আচরণবিধিতে নতুন ৭টি নির্দেশনা যুক্ত করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।

গত ২২ ডিসেম্বর নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে এক ভিডিওবার্তায় সংসদীয় ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা লেখেন, নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা বা ভোটারপ্রতি ১০ টাকা ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রার্থী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন, যা নির্বাচনকালীন অসততা ও অনিয়মের জন্ম দেয়।

তিনি বলেন, আইনে অনুমোদিত সীমার বাইরে এক টাকাও ব্যয় করবেন না—এমন প্রতিজ্ঞা থেকেই জনগণের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। তার মতে, অতিরিক্ত ব্যয়ের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির পথ খুলে দেয় এবং রাজনীতি সাধারণ মানুষের হাতছাড়া হয়ে যায়।

ডা. জারা জানান, তার আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮০ টাকা ব্যয় করা যাবে। এই অর্থ তিনি জনগণের কাছ থেকেই স্বচ্ছভাবে সংগ্রহ করতে চান।

তিনি আরো বলেন, নতুন খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে কত টাকা আসছে এবং কোথায় খরচ হচ্ছে, প্রতিটি হিসাব প্রমাণসহ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। জনগণের সহায়তায় স্বচ্ছ ও সৎ রাজনীতির একটি দৃষ্টান্ত গড়াই তার লক্ষ্য।

গত ২৮ ডিসেম্বর নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে এক ভিডিওবার্তায় বরিশাল ৫ (সদর) আসনের প্রার্থী ও বাসদের জেলা সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, সংসদ ভবন কোটিপতিদের ক্লাব নয়, সংসদ হোক জনগণের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম বেগবান করতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির, ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি আপনাদের সমর্থন ও ভোট প্রত্যাশী।

নির্বাচনের বিপুল ব্যয় নির্বাহে আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। এজন্য সহযোগিতা করতে বিকাশ, নগদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরও দিয়েছেন তিনি।

গত রোববার (৪ জানুয়ারি, ২০২৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ ও মুলাদী) আসনের প্রার্থী ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনাদের আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মূলাদী) আসনে নির্বাচন করছি। পাঁচটি বড় নদী ঘেরা প্রত‍্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলে নির্বাচনি প্রচারণার খরচ মেটাতে আপনারা দোয়া ও আর্থিক সহযোগিতা করবেন।

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লড়াই চলমান রাখা শত শত শহীদদের রেখে যাওয়া আমানত। আসুন, সকলে মিলে শহীদ ওসমান হাদির দায় ও দরদের বাংলাদেশ গড়ি, ইনসাফ ও আজাদীর লড়াই চালিয়ে যাই।

গেল বুধবার (৭ জানুয়ারি, ২০২৬) নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে এক ভিডিওবার্তায় ঢাকা ১২ আসনের প্রার্থী ও আমজনতার দলের সদস্য সচিব তারেক রহমান বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আমি ঢাকা-১২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। একটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে যে উল্লেখযোগ্য ব্যয় প্রয়োজন, তা এককভাবে বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণে আপনাদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

তিনি আরো বলেন, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের পর থেকে আপনারা আমার রাজনৈতিক পথচলা প্রত্যক্ষ করে আসছেন। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংকটময় সময়ে আমি সবসময় আপনাদের পাশে থেকেছি। আবার বিপদের মুহূর্তে আপনাদেরও পাশে পেয়েছি। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভাইয়েরা, ব্যবসায়ী সমাজ এবং চাকরিজীবী ভাই-বোনদের সহযোগিতায় আমি বহুবার কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি।
তারেক বলেন, আজ সেই আস্থার জায়গা থেকেই ঢাকা-১২ আসনের নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাইছি। আপনাদের সহযোগিতা পেলে আমি আমার নির্বাচনি কার্যক্রম সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে পারব। একইসঙ্গে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী—আপনাদের সমর্থন ও পাশে থাকার মাধ্যমে ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ। আপনাদের পাশে পাওয়া আমার জন্য শক্তি ও অনুপ্রেরণা।

একই দিনে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী দলটির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ লেখেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসন থেকে আপনাদের প্রতিনিধি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আজকে একটি স্পষ্ট বিশ্বাস ও নৈতিক অঙ্গীকার আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। আমি এমন একটি রাজনীতিতে বিশ্বাস করি, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানুষ বড়, স্বার্থের চেয়ে সততা বড় এবং প্রভাবের চেয়ে ইনসাফ বড়। উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, ভবন বা অবকাঠামো নয়—উন্নয়ন মানে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে ন্যায়বিচার থাকবে, বৈষম্য থাকবে না এবং জনপ্রতিনিধি সর্বদা জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকবে।

তিনি লেখেন, আমি শুরু থেকেই একটি বিষয় পরিষ্কার রাখতে চেয়েছি—আমার রাজনীতি কোনো ব্যক্তি, কোনো ব্যবসায়ী কিংবা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অর্থে পরিচালিত হবে না। কারণ বড় অঙ্কের অর্থ প্রায়ই বড় শর্ত নিয়ে আসে, যা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

এনসিপির এই নেতা লেখেন, আমি চাই না হাতিয়ার মানুষের অধিকার কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে আপসের শিকার হোক, কিংবা একজন জনপ্রতিনিধির ওপর কোনো অদৃশ্য ঋণের চাপ থাকুক। যার অর্থে রাজনীতি চলে, শেষ পর্যন্ত রাজনীতি তার কথাই শোনে—আমি চাই, আমার রাজনীতি শুনুক কেবল হাতিয়ার সাধারণ মানুষের কথা। এই কারণেই আমি আপনাদের কাছ থেকেই সমর্থন ও সহযোগিতা চাইছি। আপনাদের ছোট ছোট অবদান শুধু একটি নির্বাচনি প্রচারণার খরচ নয়, এটি একটি নৈতিক অবস্থান, একটি বার্তা—যে হাতিয়ার মানুষ নিজের প্রতিনিধি নিজেই গড়ে তুলতে চায়। এই অংশগ্রহণ আমাকে ভবিষ্যতে আপনাদের কাছে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানোর নৈতিক অধিকার দেবে, আর সেটাকেই আমি একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় শক্তি মনে করি।

তিনি লেখেন, আমি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনারা যে আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে আমার পাশে দাঁড়াবেন, তার জবাব আমি দেব কাজ দিয়ে, কথার ফুলঝুরি দিয়ে নয়। হাতিয়ায় ইনসাফভিত্তিক, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন উন্নয়নের যে স্বপ্ন আমি দেখছি, তা বাস্তবায়ন সম্ভব কেবল আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণেই। আসুন, আমরা একসাথে প্রমাণ করি, সৎ রাজনীতি এখনো সম্ভব, আর তা সম্ভব জনগণের শক্তিতেই। হাতিয়ার মর্যাদা, ন্যায় ও ভবিষ্যতের জন্য আপনাদের পাশে চাই।

হান্নান মাসউদ লেখেন, আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো অঙ্কের অনুদান আমাদের এই লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে। ইনশাআল্লাহ, আপনাদের আমানতের প্রতিটি পয়সার হিসাব আমি স্বচ্ছতার সাথে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব, ইনশাআল্লাহ।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি বড় ধরনের ঝুঁকির সম্ভাবনাও রয়েছে। অনেক সময় প্রার্থীর নাম ব্যবহার করে ভুয়া পেজ খুলে টাকা হাতিয়ে নিতে পারে সাইবার অপরাধীরা। ক্রাউডফান্ডিংয়ের আড়ালে অবৈধ অর্থ নির্বাচনি বৈতরণী পার করতে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনলাইনে কত টাকা জমা পড়ছে এবং তা কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তার কোনো কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।

দেশেরবনির্বাচনি বিশ্লেষকরা কেউ কেউ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কাউকে আর্থিক সহযোগিতা করার আগে অবশ্যই প্রার্থীর ভেরিফাইড প্রোফাইল যাচাই করা উচিত। এ ছাড়া যেকোনো লিংকে ক্লিক করে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের মানুষের টাকায় অনেকেই প্রার্থী হয়ে ফেসবুক, ইউটিউব, বিকাশ, ব্যাংক এ্যাকাউন্ট সহ‘ ক্রাউডফান্ডিংয়ে’ আবেদন করে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে নানাবিধ কৌশলে টাকার পাহাড় গড়ে তুলছেন। ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে বস্তায় বস্তায় টাকা, নামে- বেনামে টাকা উত্তোলন ও লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে অবশেষে অনেকটাই নড়েচড়ে বসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসব বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছে ইসি ও দেশের আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থাগুলো। এমনটা ভাবছে দেশের সর্বস্তরের জনগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com