সওজে সক্রিয় ‘কাদের চক্র’, নেপথ্যে আজাদ–মঈনুল–নুরু ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে সংস্কারের দাবি জোরালো হলেও সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরে (সওজ) তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সিন্ডিকেট—‘কাদের চক্র’—এখনও কার্যত বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তনের আড়ালে আওয়ামীপন্থী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন চলছে—এমন অভিযোগ সওজের অভ্যন্তরীণ মহলে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

আবারও আলোচনায় এ.কে.এম আজাদ রহমান
এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান। ফখরুদ্দিন–মঈনউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যিনি দুর্নীতি অনুসন্ধান কমিশন (ট্রুথ কমিশন)-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন।

প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, অতীতের সেই বিতর্ক সত্ত্বেও আজাদ রহমান দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। সর্বশেষ বদলিতে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে তাকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সংস্কার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে।

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে, সওজের ভেতরে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই “সর্বোচ্চ আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, গত এক যুগে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ বলয়ের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

আজাদের ‘ডানহাত’ নুরু ইসলাম
আজাদ রহমানকে ঘিরে আরেকটি নাম নিয়মিতভাবে উঠে আসছে—ইঞ্জিনিয়ারিং নুরু ইসলাম। সওজের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, বদলি বাণিজ্য, ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংবেদনশীল প্রশাসনিক কার্যক্রম মূলত তাকেই দিয়ে পরিচালনা করা হতো।

সূত্রের দাবি, আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা বহু অভিযোগের বাস্তবায়নকারী হিসেবে নুরু ইসলাম কাজ করতেন, ফলে সরাসরি দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতেন আজাদ রহমান।

‘কাদের চক্র’: উত্থান ও কাঠামো
সওজের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে ‘কাদের চক্র’ একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক সিন্ডিকেটে রূপ নেয়। এই চক্র মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে—
১) বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ
২) প্রকল্প ও ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা
৩) অর্থনৈতিক সুবিধা ও বিদেশ সফর ব্যবস্থাপনা
এই তিন স্তরের সমন্বয়ে প্রভাবশালী প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদেশ সফরের আড়ালে অর্থপাচারের অভিযোগ
দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরপরই অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। দাপ্তরিকভাবে এগুলোকে “প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়” বলা হলেও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সূত্রগুলো ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে।

তাদের দাবি, এসব সফরের মাধ্যমে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবারের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল হাসানের ভূমিকা
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং আইইবি নির্বাচনে দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিত হন।
সূত্রের দাবি, তার নেতৃত্বেই বর্তমানে সওজে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে—যেখানে কৃত্রিম “ঠিকাদার সংকট” সৃষ্টি করে জনদুর্ভোগ বাড়ানো হচ্ছে, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে আজাদ রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ নুরু ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ।

সংস্কারের নামে প্রহসন?
সওজের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, “যারা আজ সংস্কারের কথা বলছেন, তারাই অতীতে দুর্নীতির অংশ ছিলেন।” বদলি, টেন্ডার ও বিদেশ সফর—সবকিছু এখনো পুরনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘কাদের চক্র’ কেবল একটি প্রশাসনিক সিন্ডিকেট নয়; এটি একটি রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যা আমলাতন্ত্র, ঠিকাদারি এবং বিদেশি লবিং—এই তিন স্তরে বিস্তৃত।

একজন সাবেক সচিবের ভাষায়,
“যতদিন সওজে আজাদ–মঈনুল–নুরুদের মতো কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন, ততদিন প্রকৃত সংস্কার কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com