কাসেম ও মুশফিকুর সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি সাউথইস্ট ব্যাংক…. !

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাতের আলোচিত প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা, পরিচালনা কাঠামো এবং শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান এম এ কাসেমকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগ এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ভাগ্নি জামাই মুশফিকুর রহমানের প্রভাবকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেটের নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সংকেত হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোতে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠী শুধু নীতিনির্ধারণেই নয়, বরং নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়াতেও হস্তক্ষেপ করছে। ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অপছন্দের কর্মকর্তাদের বদলি করা এবং পছন্দের ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল পদে বসানোর মাধ্যমে একটি স্বার্থান্বেষী বলয় শক্তিশালী হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের একাংশের অভিযোগ, চেয়ারম্যান এম এ কাসেম দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকলেও বর্তমানে বয়সজনিত কারণে আগের মতো সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং পেশাদারিত্বের ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নেতৃত্বের দুর্বলতা একটি ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর ফলে গ্রাহকদের আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এই অবস্থায় অনেকে ব্যাংকের স্বাভাবিক পরিচালনা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে এবং কিছু আমানতকারী তাদের জমাকৃত অর্থ তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, মাঠপর্যায়ের তথ্য ও গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। এতে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মুশফিকুর রহমানকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে ওঠার দাবি করা হচ্ছে। তিনি বর্তমানে ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং লজিস্টিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রভাবের কারণে নিয়োগ, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, লজিস্টিক বিভাগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয় এবং অবকাঠামোগত কাজে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এ ধরনের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, ফলে অনিয়মের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসছে না।

অন্যদিকে চেয়ারম্যান এম এ কাসেমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করেছে। বিষয়টি ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। দুদক সূত্রে জানা গেছে, জমি ক্রয়, তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম এবং অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনার ক্ষেত্রে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কম মূল্যের জমি বেশি দামে দেখিয়ে অর্থ লোপাটের দাবি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় জমি কেনার ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্যে জমি কেনা এবং জমি ভরাটের কাজে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, জ্বালানি এবং চালকের বেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে বহন করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত কমিটি গঠন করে সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাউথইস্ট ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের আর্থিক লেনদেন স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে এবং একটি ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তারা বলছেন, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্য প্রতিষ্ঠানের অর্থ একই ব্যাংকে রাখার বিষয়টি নৈতিকতার দিক থেকেও আলোচনার জন্ম দেয়।

এসব অভিযোগের প্রভাব সরাসরি পড়ছে ব্যাংকের গ্রাহকদের ওপর। অনেক আমানতকারী তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা সবচেয়ে বড় বিষয়। পরিচালনায় স্বচ্ছতা না থাকলে দ্রুত গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয় এবং তা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সংস্কার জরুরি। পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সংকট মোকাবিলা সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, সাউথইস্ট ব্যাংককে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর এখন নির্ভর করছে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com