যমুনার তীরে নিঃস্ব মানুষের হাহাকার, ‘আমরা যাব কোথায় ?

ডেস্ক রিপোর্ট : পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে প্রমত্তা যমুনা। নদীর গর্জনের সঙ্গে যেন মিলিয়ে যাচ্ছে চরাঞ্চলের যাচ্ছে মানুষের হাসি, স্বপ্ন আর জীবনের সঞ্চয়। একসময় যেখানে ছিল সবুজ ফসলের মাঠ, শিশুদের কোলাহল আর শত শত পরিবারের বসতি, আজ সেখানে শুধু উত্তাল নদীর স্রোত।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন প্রতিটি দিন শুরু হয় নতুন করে ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে।

স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরে যমুনার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নের চরাঞ্চলে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি, বারপাখিয়া, মোহনপুর ও বৃহৎ হাতকোড়া গ্রামে শুরু হওয়া ভাঙনে বসতবাড়ির পাশাপাশি প্রায় ৬০০ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। এতে অন্তত ছয় গ্রামের শত শত পরিবার এখন ভিটেমাটি ও জীবিকার সবকিছু হারিয়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।

ধীতপুর গ্রামের শতবর্ষী রহিতন বেগমের জীবনে এখন শুধু হারানোর গল্প। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার এই জীবনে সুখের দেখা পেলাম না। সারাজীবন কষ্ট করেছি। এখন শেষ বয়সে এসে যমুনা সব কেড়ে নিচ্ছে। স্বামীহারা মেয়েকে নিয়ে ভাঙা টিনের ঘরে থাকি। সেটাও নদীর মুখে। এই ঘরটাও যদি চলে যায়, আমরা কোথায় যাব?” তার চোখের জল যেন পুরো চরাঞ্চলের নীরব কান্না হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন মাসে শুধু শ্রীপুর থেকে বারপাখিয়া পর্যন্ত ছয়টি গ্রামের প্রায় ৩০০ বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে মসজিদ ও মাদ্রাসাসহ বহু স্থাপনাও হারিয়ে গেছে। একসময় যে চরাঞ্চল ছিল সবজি ও রবিশস্যের ভাণ্ডার, আজ সেখানে শুধু নদীর ভাঙনের দাগ। পটোল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকলাই, সরিষাসহ নানা ফসলের আবাদে ভরপুর এই এলাকা এখন প্রায় নিঃস্ব।

কুরসি গ্রামের কৃষক ইয়াসিন মোল্লা বলেন, “আমাদের গোষ্ঠীর প্রায় ৬০ বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।” প্রতিদিনই ঘর ভাঙার আতঙ্কে দিন কাটছে গ্রামবাসীর।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, গত তিন-চার মাসে ৩৫০ থেকে ৪০০টি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই কয়েক মিটার করে জমি হারিয়ে যাচ্ছে। পুরো চরাঞ্চল এখন আতঙ্কে আছে। তিনি দ্রুত স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান।

৭৩ বছর বয়সী আতাহার মণ্ডলের জীবন যেন নদীভাঙনের জীবন্ত ইতিহাস। তিনি বলেন, “আমি জীবনে প্রায় ২০ বার বসতভিটা হারিয়েছি। কিন্তু এবারের ভাঙন সবচেয়ে ভয়াবহ। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কেউ আমাদের পাশে নেই। আমরা এখন কোথায় যাব?” তার কণ্ঠে শুধু হতাশা আর নিঃস্বতার দীর্ঘশ্বাস।

নদীভাঙনের থাবা এবার পৌঁছে গেছে শিক্ষাঙ্গনেও। সদিয়া দেওয়ানতলা সংকরহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ বলেন, “বিদ্যালয় ভবন থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে ভাঙন। এর পাশাপাশি পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে।”

“আমরা কি শুধু হারাতেই জন্মেছি?” প্রশ্ন তুলে স্থানীয় শিক্ষক শিশির আহম্মেদ ও শিক্ষার্থী আমিরুল ইসলামসহ কয়েকজন জানান, প্রতিদিন চোখের সামনে জমি, ঘর, জীবিকা সব নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো চরাঞ্চল মানচিত্র থেকেই মুছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, গত এক বছরে প্রায় ২৫০ হেক্টর (৬১৭ একর) ফসলি জমি যমুনায় বিলীন হয়েছে। নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়ছে।

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নের চরাঞ্চলে বর্তমানে ভাঙনরোধে পাউবোর কোনো প্রকল্প নেই। তার ভাষ্য, “স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ছাড়া এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।”

সরকারি খাতা ও দাপ্তরিক আলোচনার দীর্ঘসূত্রিতার মাঝে প্রতিদিনই যমুনার গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর মানুষের জীবনভর গড়ে তোলা স্বপ্ন। চরবাসীর বুকভরা আর্তনাদ এখন একটাই প্রশ্নে এসে ঠেকেছে- আর কত ঘর, কত গ্রাম, কত মানুষের জীবন-জীবিকা নদীতে হারিয়ে গেলে এই ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com