মনির হোসেন জীবন, বিশেষ সংবাদদাতা : রাত যত গভীর হয়, রাজধানীর সড়কে কমতে থাকে যানবাহনের সংখ্যা। এই সুযোগে বেপরোয়া হয়ে ওঠে রাতের পাখি শিকারী নামক পেশাদার ছিনতাইকারীরা। ইদানিং কালে সড়ক- মহাসড়ক ও অলিতে-গলিতে রাতে বেলায় প্রকাশ্যে চলে ছিনতাইয়ের ‘মহোৎসব’। নগরীজুড়ে বিভিন্ন গ্রুপে মাঠ দাপড়ে বেড়ায় জেলখাটা দাগি অপরাধারী সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা। এক্ষেত্রে অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে উঠতি বয়সী পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র। এ সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্যরা দামি মোটরবাইক ও প্রাইভেটকার নিয়ে দাঁপিয়ে বেড়ায় শহরের বিভিন্ন সড়ক কিংবা মহাসড়ক এমনকি উড়ালপথ । এ সময় তাদের শিকার হয় রিকশাযাত্রী বা পথচারীরা। কখনও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনিয়ে নেয় টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী। আবার কখনও ছোঁ মেরে নিয়ে যায় ব্যাগ। পেশাদার ছিনতাইকারী, দুর্বৃত্ত কিংবা অপরাধীদের বাঁধা দিতে গেলে অনেক সময় ভুক্তভোগীকে হতে হয় খুনের বলি। এমন কর্মকাণ্ড চলে ভোর অবধি। তারপর আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে আড়ালে চলে যায় এসব অপরাধীরা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ছিনতাইকারী ও অপরাধীরা পুলিশের টহল এড়িয়ে ছিনতাই করে বেড়ায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছে, ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেট হলো আইফোন মোবাইল । নগরীজুড়ে ছিনতাই বেশি, মামলা কম, উদ্ধারও কম। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা উবার-পাঠাওয়ের নাম ব্যবহার করে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে । আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে লুন্ঠিত কিংবা হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধারও করি। খবর সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত তথ্য সূত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রের।
গতকাল রোববার দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু করে ভোর রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা বিমানবন্দর সড়ক, উত্তরা, তুরাগ, আব্দুল্লাহপুর সড়ক, টঙ্গী, গাজীপুর সড়ক, মিরপুর, গাবতলি, ফার্মগেট সড়ক, কমলাপুর, গুলিস্তান, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ি সড়ক, মহাখালী, গুলশান, বনানী, মগবাজার, মালিবাগ, কাকরাইল, লালবাগ, মিরপুর, গাবতলি, নিউমার্কেট, কামরাঙ্গিচর, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেঁরিবাধ, হাতিরঝিল বেশির ভাগ এলাকাতেই পুলিশের টহল ও চেকপোস্টে গা-ছাড়া ভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ সদস্যরা। টহল গাড়িতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দূরে বসে থাকেন। কখনও কখনও তারা রিকশাযাত্রীদের তল্লাশি করতে দেখা গেলেও, ছিনতাইকারীদের মোটরসাইকেল বা প্রাইভেটকারকে তল্লাশি করা হয় না। এছাড়া উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী, বিমানবন্দর, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, সাতরাস্তা, মগবাজার, মালিবাগ সহ ফুটওভার ব্রিজ এবং উড়াল সড়কগুলো ছিনতাইকারীদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছে নগরবাসী। এছাড়া রাজধানীর সন্নিকটে শিল্পনগরী টঙ্গীর স্টেশন রোড, চেরাগআলী, টঙ্গী বাজার ঔ বাস্তহারা এলাকা হলো পেশাদার ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। তার মধ্যে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী কালিগঞ্জ, জয়দেবপুর সড়ক, টঙ্গী উড়াল সড়ক ও টঙ্গী রেলস্টেশন এলাকা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। সচেতন মহল, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত রাত ১০টার পর থেকেই শহরের বিভিন্ন রাস্তায় বেপারোয়া হয়ে ওঠে ছিনতাইকারী চক্র। একটি মোটরসাইকেলে দু’জন ছিনতাইকারী ধারালো বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন সড়কে ঘুরতে থাকে। যেসব সড়কে যানবাহন কম থাকে এবং পর্যাপ্ত আলো থাকে না, সেসব এলাকার রিকশাযাত্রী বা পথচারীদের টার্গেট করে তারা। চক্রটি এক জায়গায় ছিনতাই শেষে অন্য সড়কে চলে যায়। একই কৌশল অবলম্বন করে প্রাইভেট কারযোগে ছিনতাই করা চক্রটিও। রাজধানীতে ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রবণতা বেড়েছে জানিয়ে একাধিক ভুক্তভোগীরা দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে জানিয়েছে, চলতি বছরের গত ২ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা বঙ্গভবনের সামনের সড়কে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন দৈনিক ইনকিলাবের জ্যেষ্ঠ এক প্রতিবেদক। পুরান ঢাকার বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল যোগে আসা দুই ছিনতাইকারী তার রিকশার গতিরোধ করে। তাকে চাপাতির ভয় দেখিয়ে সঙ্গে থাকা নগর টাকা নিয়ে যায়। ইতোপূর্বে ও তিনি দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে দামি মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা খুইয়েছেন। এনিয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগও করেছেন।
ডিএমপি পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে বলেন, আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী সহ সারা দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার, পেশাদার ছিনতাইকারীসহ নানাবিধ অপরাধীদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে। কিন্তু আদালতের মাধ্যমে তারা জামিনে বের হয়ে এসে আগের মতো ছিনতাই কিংবা নতুন কোন অপরাধে জড়াচ্ছে। অপরাধ কর্মকাণ্ড চিরতরে নির্মুল করা সম্ভব নয়- জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে বলেন, রাজধানী ঢাকায় কয়েক কোটি মানুষের বসবাস যে এখানে ছিনতাই পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমরা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। পুলিশের টহল-চেকপোস্ট সবই আগের যে সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেট হলো মোবাইল ফোন। আমরা হারানো কিংবা লুন্ঠিত মালামাল উদ্ধারও করি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ( ডিএমপি)র দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে বলেন, রাজধানীতে রাতের বেলায় যত যানবাহন চলাচল করে, তার সব ক’টি তল্লাশি করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া ছিনতাইকারীরাও টহল গাড়ি বা চেকপোস্ট আছে, এমন জায়গাগুলো এড়িয়ে চলে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে জানান, রাজধানীর সড়কে অ্যাপসভিত্তিক মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার বেড়ে যাওয়ায় ছিনতাইকারীরা এর সুযোগ নিচ্ছে। টহল পুলিশ বা চেকপোস্টে তাদের তল্লাশি করলে তারা উবার-পাঠাওয়ের যাত্রী পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে। এটা শুনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি না করেই তাদের যানবাহন ছেড়ে দেন। এ ছাড়া হাতেনাতে গ্রেফতার বা তল্লাশিতে যানবাহনে বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছে কোনও ধরনের ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র না পেলে আটক করাও সম্ভব হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দৈনিক আজকের আলোকিত সকাল কে জানান, রাজধানী জুড়ে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। ছিনতাইকারীদের ভাষায় তাদের কাছে উত্তম সময় হলো ভোর। এ সময় বাস, রেল ও নৌ টার্মিনালে যাত্রীরা এসে নামে। ভোরের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে যাত্রীরা আসার সময় ছিনতাইকারীরা তাদের টার্গেট করে। এদিকে রাতভর দায়িত্ব পালন শেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তখন গা-ছাড়া ভাব নিয়ে থাকেন। ফলে এই সময়টাতেই বেশি সক্রিয় থাকে ছিনতাইকারীরা। নগরীর কর্মজীবী মানুষ ও যানবাহনের যাত্রীরা দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে জানান, আবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় কর্মজীবী নারী-পুরুষরা যখন বের হন, তখনও ওঁত পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার নিয়ে তাদের ব্যাগ ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়া কিংবা পথ আটকে স্বর্বস্ব কেড়ে নেয় চক্রটি। ছিনতাই বেশি, মামলা কম, উদ্ধারও কম। রাজধানীতে প্রতিদিন একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও থানায় মামলার সংখ্যা কম। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ছিনতাইকারীরা কম দামী মালামাল নিলে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে চান না। কেউ কেউ শুধু সাধারণ ডায়েরি করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরার বিভিন্ন এলাকার একাধিক ভুক্তভোগীরা দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে জানান, ছিনতাইয়ের খপ্পরে পড়ে থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলে পুলিশ সহজেই অভিযোগ নিতে চায় না। মামলা করলে কোর্ট-কাছারিতে দৌঁড়াতে হবে, এমন ভয় দেখিয়ে তারা জিডি করতে উৎসাহিত করে। জিডিতে সাধারণত সঙ্গে থাকা সামগ্রী হারিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করতে হয়। ফলে এসব জিডির তদন্তে তারাও তেমন গুরুত্ব দেয় না। ডিএমপির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা দৈনিক আজকের আলোকিত সকালকে বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে সার্বিকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ক্রাইম অপারচুনিটি না কমিয়ে আনলে এটি প্রতিরোধ সম্ভব নয়। রাজধানীতে যেসব এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে, সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা; ঢাকার প্রধান সড়কগুলোয় সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা, গ্রেফতার হওয়া ছিনতাইকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ছিনতাইকারী হিসেবে গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে এলে তাদের নজরদারি করাসহ অনেক কাজ একসঙ্গে করতে হবে। তাহলেই ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।
শুধু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটার পর আসামি গ্রেফতার ও মালামাল উদ্ধারের দিকে মনোযোগ বেশি দিলে অপরাধ কমানো যাবে না বলে মনে করেন তিনি।
এব্যাপারে রাজধানীতে রাতের বেলায় গনহারে ছিনতাইকারী ও দুর্বৃত্তদের হাত থেকে সর্বস্তরের মানুষের জানমালরক্ষার্থে আগের চেয়ে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার জন্য বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, পুলিশ প্রধান, ডিএমপি কমিশনার, অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ও নগরবাসী। এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।