বিচারের নৌকা কি সবসময় একই হাওয়ায় একই গতিতে চলে?

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ: হাইকোর্টে দীর্ঘদিন আইন পেশায় কাজ করে মাঝে মাঝে মনে হয়, বিচারের পাল তোলা নৌকাটি কি সত্যিই সবার জন্য একই হাওয়ায় একই গতিতে চলে? ন্যায়ের জায়গাটি যেমন পবিত্র, বিচারপতিরা যেমন নীতি ও আইনেই সিদ্ধান্ত নেন – সেটা আমাদের অকুণ্ঠ বিশ্বাস। তবু বাস্তবতার সরল রেখায় কখনো কখনো কিছু ছায়া পড়ে, যা নতুন আইনজীবী কিংবা সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মনে প্রশ্ন তুলে।

আদালতে সিনিয়র এবং প্রতিথযশা আইনজীবীদের প্রতি গভীর সম্মান, শ্রদ্ধা ও আস্থা স্বাভাবিকভাবেই থাকে। বহু বছরের অভিজ্ঞতা, যুক্তি-তর্কে দক্ষতা এবং আদালতের ভাষা ব্যবহারের পরিমিত জ্ঞান বিচারপ্রক্রিয়াকে সহজ করে। সেই জন্যই হয়তো আদালত তাঁদের উপস্থাপনাকে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে শোনেন – এটি বিচারব্যবস্থারই অঙ্গ। কিন্তু সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন সেই একই দরজা সব বিচারপ্রার্থীর জন্য সমানভাবে খোলা থাকে না। কারণ, প্রতিটি মানুষ তো আর কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে এমন একজন আইনজীবী নিয়োগ করতে পারে না। ফলে যোগ্য মামলা থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো বিচারপ্রার্থী মাঝে মাঝে হয়তো সেই বাড়তি মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হন – এটুকু বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না।

আমার আইনজীবী জীবনের এক প্রারম্ভিক অভিজ্ঞতা প্রায়ই মনে পড়ে। সরকার কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই একটি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করেছিল। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি রিট পিটিশন দায়ের করলাম। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে, নজির এবং যুক্তি সাজিয়ে আদালতে দাঁড়ালাম। কিন্তু আদালতের প্রিজাইডিং বিচারপতি প্রশ্ন ছুড়ে বললেন, “কত বছর যাবৎ হাইকোর্টে ওকালতি করছেন?” এই প্রশ্নে করে মামলার ফাইলটি টেবিলে আছড়ে ফেলে দিলেন। ভরা আদালতে সেই মুহূর্ত আমাকে এতটাই বিব্রত করেছিল যে, যুক্তি সব গুটিয়ে যেন বুকের ভেতর কোথাও জমাট বেঁধে গেল।

পরের সপ্তাহে একই মামলা, একই বেঞ্চে, আমার পরামর্শে এবং মক্কেলের অর্থে একজন প্রতিথযশা সিনিয়র আইনজীবীকে দ্বারা মুভ করালেন। তখন আর কোনো প্রশ্ন উঠেনি – বরং রুল জারি হলো, সঙ্গে ডিক্লারেশন বাতিলের আদেশের স্টে অর্ডারও। সেই একই প্রিজাইডিং বিচারপতি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর নেন। তাঁর প্রতি আমার সম্মান রেখেই সেই দিনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে – মাঝেমধ্যে মামলার মেরিটের পাশাপাশি “কারা বলছেন” – সেটিও সিদ্ধান্তে সূক্ষ্মভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ অভিজ্ঞতা আমার একার নয়। আইনজীবীদের আড্ডায় প্রায়ই শোনা যায় – একই ধরনের মামলায় সিনিয়র ও জুনিয়র আইনজীবীর উপস্থাপনায় আদালতের প্রতিক্রিয়া কোথাও কোথাও ভিন্ন হতে পারে। এটি হয়তো মানুষের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের অংশ – অভিজ্ঞ কণ্ঠস্বরের প্রতি আস্থা, পরিচিতির প্রতি স্বস্তি। কিন্তু এর মধ্যেই গরীব বিচারপ্রার্থীরা কখনো কখনো অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এ কথা বলার উদ্দেশ্য কাউকে সমালোচনা করা নয়; বরং সেই বাস্তবতার দিকে আলতো করে দৃষ্টি ফেরানো, যা বিচারব্যবস্থার সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেই মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। আদালত আরও বেশি করে যদি মামলা-মেরিটকেন্দ্রিক মনোযোগ দেন, আর নতুন বা তরুণ আইনজীবীদের বক্তব্যও সমান গুরুত্ব পায় – তাহলে বিচারপ্রার্থীর আস্থা আরও দৃঢ় হবে।

বিচারের নৌকা যদি একই বাতাসে সবার জন্যই সমানভাবে চলে – তাহলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা আরও পরিপূর্ণ, আরও প্রাজ্ঞ হয়ে উঠবে। এটিই আমাদের প্রত্যাশা, আর এটিই বিচারব্যবস্থার প্রকৃত রূপ ও সৌন্দর্য।

লেখক: সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com