ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে ডিলারদের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকিপ্রাপ্ত সারের বড় অংশই চলে যাচ্ছে কালোবাজারে—এমন অভিযোগ উঠেছে কৃষকদের পক্ষ থেকে। বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলাররা নিয়মিত সরকারি গুদাম থেকে সার উত্তোলন করলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে সেই সার মিলছে না। ফলে আলু ও বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে কৃষকরা বাধ্য হয়ে চড়া দামে চোরাই বাজার থেকে সার কিনছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরের বরেন্দ্র এলাকাজুড়ে একটি সংঘবদ্ধ সার পাচার সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। বাফার গুদাম ও বিভিন্ন মোকাম থেকে ডিলারদের বরাদ্দকৃত সারের একটি অংশ দোকানে আনা হলেও সিংহভাগই পাচার হচ্ছে চোরাই ফড়িয়াদের হাতে। অভিযোগ রয়েছে—এক উপজেলা বা জেলার জন্য বরাদ্দকৃত সার পাচার হয়ে অন্য উপজেলায় বিক্রি করা হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার মনিটরিং কমিটি থাকলেও বাস্তবে এসব কমিটির কার্যক্রম কার্যত অকার্যকর। বরং স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, কিছু জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসনের একটি অংশ এবং পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশেই সারের কালোবাজার দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে। কোথাও কোথাও লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে কিছু সার জব্দ করা হলেও নামমাত্র জরিমানা করেই দায় সারা হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
তানোর উপজেলার মোহর গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, সরকারি হিসাবে ৫০ কেজির ডিএপি সারের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও তাকে কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। একইভাবে টিএসপি ও এমওপি সারেও অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “ডিলারের দোকানে গেলে বলা হয় সার নেই। অথচ ফড়িয়াদের কাছে পর্যাপ্ত সরকারি সার পাওয়া যাচ্ছে।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, তানোর উপজেলায় মাসুদ নামে এক ব্যক্তি বিএডিসির বীজ ডিলার হলেও তার সার বিক্রির কোনো অনুমতি বা লাইসেন্স নেই। অথচ তিনি ট্রাক-ট্রাক সরকারি সার এনে চড়া দামে বিক্রি করছেন। তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয় কয়েকজন অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকেই তিনি সার সংগ্রহ করেন। যদিও অভিযুক্ত এক ডিলার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কৃষকরা অভিযোগ করছেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব হলেও তাদের অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল্লাহ বলেন, “আমরা নিয়মিত ডিলারদের স্টক যাচাই করি। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পাচারের তথ্য আমাদের কাছে নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলের আলুচাষ ও বোরো আবাদ সম্প্রতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এসব ফসলে বিপুল পরিমাণ সার প্রয়োজন হওয়ায় প্রতি বছর এই সময়টাতেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ কৃষকদের। নাচোল, নিয়ামতপুর, মান্দা, গোদাগাড়ী ও মোহনপুর এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এরই মধ্যে বাগমারা ও দুর্গাপুর এলাকায় সারের ট্রাক আটক ও জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন কৃষকরা।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, বরেন্দ্র অঞ্চলে সার পাচার ও কালোবাজার বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পাচারে জড়িত ডিলার ও তাদের সহযোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা তাদের।