উত্তরার ফুটপাত জুড়ে বসেছে শতশত সারিসারি অবৈধ দোকানপাট? শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত

# ফুটপাতে শতশত ভ্যানগাড়ি
# গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একাধিক সিন্ডিকেট
# টাকা তোলে কারা? ভাগ পায় কারা?

বিশেষ সংবাদদাতা : রাজধানীর অভিজাত এলাকা উত্তরার ফুটপাত জুড়ে বসেছে শীতবস্ত্র বেচাকেনার হাঁট। দেশে গত কয়েকদিন ধরে শীতের তীব্রতা আগের চেয়ে কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরা বিভাগের রাস্তা, ওয়ার্কওয়ে ও ফুটপাতে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠেছে শতশত দোকানপাট। সারিসারি ভ্যান গাড়ি কিংবা রাস্তার পাশে গরম কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের জামা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেচাকেনা করছে ব্যবসায়ীরা। ইদানিংকালে এই ধরনের ব্যবসার চাহিদা বেশি এবং ফুটপাতের দোকানগুলোতে জমে উঠেছে শীতের কাপড় বেচাকেনা। সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টরা বলছে, উত্তরা বিভাগের ফুটপাতে গড়ে উঠা ব্যবসায়ীদের পোয়া বারো, তাদের বেচাকেনাও বেশি। টাকার ভাগ পায় প্রশাসন থেকে শুরু করে কতিপয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের রয়েছে শক্তিশালী একাধিক সিন্ডিকেট। প্রতিদিন এবং সপ্তাহের বিশেষ কোনো দিন ফুটপাতের এসব শতশত ভ্যানগাড়ি ও দোকানপাট থেকে অবৈধ উপায়ে মাসোহারা টাকা তোলা হয়। তাহলে জনমনে প্রশ্ন? এতো টাকা যায় কোথায়? কারা পায় টাকার ভাগ? এনিয়ে সর্বসাধারণের মাঝে কৌতূহল এবং কিছুটা হলেও সংশয় দেখা দিয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্থ তথ্য সূত্রের।

গত বুধবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও আজ শনিবার (১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫) একটানা চার দিন উত্তরা বিভাগের উত্তরা পশ্চিম, উত্তরা পূর্ব, বিমানবন্দর, তুরাগ, দক্ষিণখান ও খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকা সরজমিন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সংসদীয় ঢাকা -১৮ আসন তথা উত্তরা বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নারী-পুরুষ ও শিশুসহ অন্যরা ভিড় করেছেন ফুটপাতে বসা এসব সস্তা কাপড়ের দোকানগুলোতে। এই শীতে প্রতিদিন দুপুরের পর থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত কেনাবেচা করেন দোকানিরা। এদিকে, দোকানিরাও কম দামের কাপড় নিয়ে বসেছেন ফুটপাতে, ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক, আজমপুর বাসস্ট্যান্ড, হাউজ বিল্ডিং, আব্দুল্লাহপুর, রাজলক্ষ্মী মার্কেট, জসিমউদদীন রোড, এয়ারপোর্ট (বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ড), রেললাইন ও রেলওয়ে স্টেশন এর সামনে খালি জায়গা আর সড়কের দুই পাশে বসেছে নতুন ও পুরনো কাপড়ের হাঁট।

এছাড়া উত্তরা ১, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ নং সেক্টর, সোনারগাঁও জনপদ রোড, দলিপাড়া, আহালিয়া, খালপাড় (বড় মসজিদ), গনকবরস্হান, রুপায়ন সিটির সামনে, ডিয়াবাড়ি মেট্রোরেল স্টেশন, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস উত্তরা, রবীন্দ্র সরনী সড়ক, আজমপুর রেললাইন ও আব্দুল্লাহপুর বেরিবাধ সড়ক, কামারপাড়া, পলওয়েল মার্কেট, জমজম টাওয়ারের সামনে, পার্কের সামনে, সেক্টর গুলোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, খেলার মাঠ, আবাসিক হোটেল, নামি-দামি রেস্তোরাঁ, স্কুল, কলেজ, ফুটওভারব্রিজ কালভার্টের উপর এবং আশপাশের সড়কসহ ফুটপাত বাজারের দিকেই ঝুঁকে পড়ছেন অনেক ক্রেতারা। চারদিন দিবা রাত্রি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শীত থেকে রেহাই পেতে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ সকলেই কিনছেন শীতের কাপড়। তবে এসব ক্রেতাদের বেশির ভাগই নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। দেখে-শুনে কম দাম করে তারা কম দামের এসব নতুন এবং পুরনো কাপড় কিনছেন ক্রেতারা। অল্প আয়ের মানুষ গুলো ছুটে যাচ্ছেন এসব কাপড়ের দোকানে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কৌশলে সিন্ডিকেট করে ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন টাকা। অন্যদিকে, উত্তরা মডেল টাউনের বিভিন্ন নামি-দামি মার্কেটগুলোতে বেচাকেনা কম বলছেন মার্কেট ব্যবসায়ী ও দোকানীরা। তারা ফুটপাত দখল মুক্ত করার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট জোর দাবি জানান।

উত্তরার আজমপুরে ফুটপাতের দোকানে কাপড় কিনতে আসা ছদ্মনাম শাকিব নামে এক ব্যবসায়ী জানান, শীত নিবারণের জন্য প্রয়োজন গরম কাপড়। মার্কেটে কাপড়ের দাম বেশি। ফুটপাতে নতুন ও পুরনো কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম, আর দেখতেও খুব ভালো। তাই ফুটপাতের কাপড়ের দোকানের কিনতে এসেছি। আমি একটি গেঞ্জি কিনেছি বলে জানিয়েছেন ওই ক্রেতা। রাজলক্ষ্মী এলাকার ফুটপাতের দোকানি ছদ্মনাম মজনু ও রফিক এ প্রতিবেদককে জানান, এসব কাপড় আমরা পুরান ঢাকা ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন হাট-বাজারে ভ্রাম্যমাণ দোকানে করে বিক্রি করি। দাম কম হওয়াতে বেচাকেনা কম আর বেশি হচ্ছে। এ সময় শীত যতই বাড়বে এই কাপড়ের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছেন ওই দোকানি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরা ও তুরাগ এলাকাবাসীরা এ প্রতিবেদককে জানান, ঢাকা -১৮ আসনের উত্তরা ১, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫নং সেক্টরসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে শতশত অবৈধ দোকানপাট ও ভ্যান গাড়িতে সয়লাব হয়ে গেছে। সড়ক, মহাসড়ক ও ৪/৫ টি ফ্লাইওভার ব্রিজ হকারদের দখলে চলে গেছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের নেতা, তাদের সাঙ্গপাঙ্গ, স্থানীয় থানা পুলিশ সদস্য এবং কতিপয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দোকানীদের নিকট থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক ভিত্তিতে মোটা অঙ্কের টাকা মাসোয়ারা নিয়ে ব্যবসায়ীদেরকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা নিচেছন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংসদীয় এ গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে প্রায় ২০/৩০ হাজার ফুটপাত গড়ে উঠেছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউজ) এর পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে লোক দেখানো উচেছদ অভিযান চালানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরা বিভাগের পুলিশের একজন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে উচেছদ অভিযান চালানো হয়। অনেক সময় রাস্তাঘাটে অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। তিনি আরো বলেন, প্রশাসনের পরিচয় দিয়ে কেউ যদি অবৈধ ফুটপাত থেকে টাকা তুলে কিংবা নিয়ে থাকে অভিযোগ কিংবা প্রমান পেলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নেয়া হবে।

এদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউজ) এর ডেপুটি ডিরেক্টর পদমর্যাদা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, সরকারি পরিত্যক্ত জায়গায় দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা বিভিন্ন দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফার্নিচার মার্কেট ও ফুটপাত খুব শিগগিরই উচেছদ করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউজের প্রথম শ্রেণির একজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট জানান, রাজধানীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত আছে। দেশে একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে অবৈধ স্হাপনাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোড়ালো ভাবে পরিচালনা করছে।

এব্যাপারে উত্তরা বিভাগে ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠা সরকারি জায়গা ও ওয়ার্কওয়ে জবরদখল করে অবৈধ দোকানপাট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চালানো জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউজ) এর চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ উপদেষ্টার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ঢাকা -১৮ আসনের সর্বস্তরের জনগন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : উত্তরা বিভাগের ফুটপাত দখল- বেদখল, চাঁদাবাজী সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপাত্ত নিয়ে সরজমিন ধারাবাহিক প্রতিবেদন আগামীতে আসছে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com