আমি সংখ্যালঘু হিন্দু, আমাকে আপনারা তেড়ে দেন: সুমিত সরকার 

জেলা প্রতিনিধি: দুই দোকানে তালা দিল বিএনপি নেতারা
আমি সংখ্যালঘু হিন্দু, আমাকে আপনারা তেড়ে দেন। নিজের শেষ সম্বল দোকানটি স্থানীয় বিএনপি নেতারা দখল করে তালা মেরে রাখার পর ক্ষোভে দুঃখে কান্নারত অবস্থায় এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন অসহায় সুমিত সরকার। 

২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি, গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে হরিনারায়নপুর বাজারে হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত বিএনপি নেতাদের শাস্তি দাবি করেছে ব্যবসায়ীরা। 

সুত্র বলছে, ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের একটি অংশ দখল, লুটপাট, চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েছে। এমনকি জনসম্মুক্ষে হুমকি ধামকি দিতেও পিছপা হচ্ছে না তারা। ইতিপূর্বে হরিনারায়নপুর বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদা দাবি করার প্রেক্ষিতে এই বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে ব্যবসায়ী সমাজ। বিষয়টি নিয়ে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এবার অসহায় ৩ সংখ্যালঘু পরিবারের শেষ সম্বল দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। ইতিমধ্যে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে দুটি দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেয় স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির একাংশ। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান- গত মঙ্গলবার সকালে হরিনারায়নপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সার্চ কমিটির সদস্য রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজের নেতৃত্বে ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি ও সার্চ কমিটির সদস্য আশরাফুল ইসলাম চতুর, সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান, রবিউল ইসলাম, নাসির, বণিক সমিতির সভাপতি শামসুল, রবিউল ইসলাম, রাশিদুল ইসলাম, রুহুল আমিন, রাজিবুল ইসলামসহ ২০/৩০ জন হরিনারায়নপুর বাজারের যুগোল কিশোর সাহা সড়কে অবস্থিত কাকলী বুক ডিপোতে তালা ঝুলিয়ে দেয়। সেসময় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদেরকে বাঁধা দিলেও তারা কোন বাঁধা মানেনি। উল্টো যারা বাঁধা দিতে এসেছেন তাদেরকে হুমকি ধামকি দিয়ে চলে যেতে বাধ্য করেছেন তারা। এমনকি বণিক সমিতির নেতৃবৃন্দ বাঁধা দিলেও কোন লাভ হয়নি। 

ঘটনার বরাত দিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মৃত. শেখরেন্দ্র সরকারের ৩ ছেলে সুমিত সরকার, অমিত সরকার ও সুবির সরকার তাদের পৈতৃক জমিতে দোকান নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। ইতিপূর্বে ১৯৯৩ সালে দখল নেওয়ার জন্য মৃত আব্দুর রহমানের ওয়ারেশ রবিউল ইসলাম, রাশিদুল ইসলাম, রুহুল আমিন, রাজিবুল ইসলাম উল্লেখিত জমিতে নির্মাণকৃত দোকান ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে একরাতের ভেতর নতুন দোকান নির্মাণ করে। পরদিন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ নতুন নির্মাণকৃত ঐ দোকান ভেঙ্গে দেন। এরপর রবিউল ইসলাম, রাশিদুল ইসলাম, রুহুল আমিন, রাজিবুল ইসলামগণ আদালতে পর পর ৩টি মামলা দায়ের করেন। ২০০১ সালে মামলাগুলোর রায় শেখরেন্দ্র সরকারের ৩ ছেলের পক্ষে হয়। রায়ের বিপক্ষে বাদীপক্ষ আপীল করলে ২০০২ সালে আপীলের রায়ও শেখরেন্দ্র সরকারের ওয়ারিশগণের পক্ষে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন কোন সমস্যা না হলেও গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে এই জমি দখল আবারো নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে মৃত আব্দুর রহমানের ওয়ারেশ। বিভিন্ন সময় জমির দখল নিতে নানা ধরনের হুমকি ধামকি দিতে থাকে তারা। সবশেষ স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজের নেতৃত্বে গত মঙ্গলবার সকালে দুটি দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেয় তারা। 

ভুক্তভোগী সুমিত সরকার বলেন, আমরা অসহায় মানুষ। আমাদের না আছে টাকা, না আছে জনবল। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আদালতের রায় উপেক্ষা করে আমাদের জমি দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। হিন্দু আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন সময় অকথ্য ভাষায় আমাদেরকে গালিগালাজ করা হচ্ছে। আমাদের শেষ সম্বল যদি কেড়ে নিতে হয় তাহলে পরিবার সহ আমাদেরকে একবারে হত্যা করে নিয়ে যাক। শেষ সম্বল এই দোকান নিয়ে নিলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হরিনারায়নপুর বাজারের একাধিক ব্যবসায়ীরা জানান, ৫ আগষ্টের পর থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি নেতা রিয়াজ ও তার পেটুয়া বাহিনীর সদস্যরা। তারা ব্যবসায়ীদের থেকেও চাঁদাবাজি করেছে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে। বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্যায়ভাবে অসহায় সুমিত সরকারের শেষ সম্বল দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। 

সরাসরি ক্যামেরায় কথা না বললেও বণিক সমিতির এক নেতা কথা বলেন প্রতিবেদক দলের সাথে। তিনি বলেন, সত্যের পক্ষে কথা বলায় উপর থেকে তার চাপ আসছে। বাধ্য হয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের পক্ষে কাজ করতে পারছেন না। ৩০ বছর আগে যে জমি অবৈধ ছিল, ৩০ বছর পর সে জমি বৈধ হয় কিভাবে। আর দখল করার চেষ্টাও চলে কিভাবে। 

এদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে হরিনারায়নপুর বাজারের উল্লেখিত দোকানের সামনে ভুক্তভোগীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে কয়েকশ লোক সমাগম হয়। সেসময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অফিসার ইনচার্জ ও একাধিক গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। উপস্থিত সকলের সামনে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা রিয়াজ উপস্থিত হয়ে বলেন,”তোরা ১৬ বছর অনেক জালিয়েছিস, আর না। তোদেরকে আর কোন ছাড় দেওয়া হবে না।” সেসময় উপস্থিত এক সাংবাদিক দোকানে তালা মারা অপরাধ কিনা জানতে চাইলে রিয়াজ বলেন, অবশ্যই না। এই বক্তব্যটি ক্যামেরার সামনে বলার জন্য অনুরোধ করলে সাংবাদিকের উপর চড়াও হন তিনি। তখন পুলিশের দল তালা খোলার জন্য অনুরোধ করলে তখনও তিনি রাজি হননি। 

হরিনারায়নপুর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম চন্দন বলেন, ৩০/৩২ বছর আগে এরা একবার এই জমি দখল করে রাতারাতি দোকান নির্মাণ করেছিল। সেসময় তৎকালীন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আমরা সকলে মিলে জমিটি দখলমুক্ত করেছিলাম। সেই জমি আবারো দখলের চেষ্টা চলছে। গত ১৬ বছর আমরা কথা বলতে পারিনি এখনও পারিনা।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অফিসার ইনচার্জ মেহেদী হাসান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দোকানের তালা খুলে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি। একপর্যায়ে বিএনপি নেতা রিয়াজুল ইসলামকে বুঝিয়ে তালার চাবি নিয়ে থানায় ফিরে যান তিনি। এছাড়া আগামীকাল সকালে দু’পক্ষকে থানায় হাজির হতে বললেও বাদ সাধেন‌ রিয়াজুল ইসলাম। পরবর্তীতে আগামীকাল বিকেলে থানায় বসার সময় দেন রিয়াজ। 

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইসমাইল হোসেন মুরাদ প্রতিবেদককে মুঠোফোনে জানান,”আমি প্রাথমিকভাবে অবগত না। আপনার মাধ্যমে প্রথম শুনলাম। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে আলোচনা করে আপনাদের সাথে কথা বলছি।”

প্রসঙ্গে কথা বলতে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ’র মুঠোফোনে ফোন দেওয়া হলে তিনি বলেন, আমি ঢাকায় আছি। একটু পর কথা বলবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।