রাজনৈতিক দ্বিমুখি চাপে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনূসের সরকার প্রশ্নবিদ্ধ!

এম. আকতারুজ্জামান : বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি জটিল সময় অতিক্রম করছেন। রাজনৈতিক বাস্তবতায় একদিকে রাষ্ট্রকে একটি সংঘাত মুক্ত ও সকলের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর করা একটি নৈতিক দায়িত্ব। অন্যদিকে দুর্নীতি, মব-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক সহ আইনশৃঙ্খলা এবং সুবিধাভোগীদের পুনরুত্থান সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে এই দ্বিমুখী চাপে প্রশ্নবিদ্ধ ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের অন্তবর্তী কালীন সরকার।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে ফিরিয়ে আনলেও আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠন এর জন্য কাজ করলেও বহু দুর্বলতা ও রয়ে গেছে বর্তমান অন্তবর্তী কালীন সরকারের কর্মকাণ্ডে। বিশেষ করে প্রশাসনে আমলাতন্ত্রে হাসিনা সরকারের দাপট বাজদের একছত্র আধিপত্য অনেকাংশে বিদ্যমান। বর্তমানে দুর্নীতি পরিস্থিতির উন্নয়নের ব্যর্থতা দেশের জনগণের উদ্বেগকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এ অবস্থায় আসন্ন ত্রোয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হলে অন্তবর্তীকালীন সরকারকে সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি যথার্থ স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন সাংবিধানিকভাবে স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপের কারণে ইসির স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়। ড.মোহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে প্রকাশ্যে ইসির পূর্ণকর্তৃত্ব পুনর্ব্যক্ত করতে হবে এবং তা বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে – নির্বাচনে দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আনুষাঙ্গিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক নিরাপত্তার ওপর ইসির স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

প্রয়োজনে ইসির সঙ্গে স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসাবে সচ্চ ইমেজের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও নিরপেক্ষ নাগরিক প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে ইসির বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে।

প্রশাসন ও নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিতে হবে ঃ নির্বাচনের পথে বড় বাধা হল প্রশাসনে এবং নির্বাচনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দলীয় মনোভাব সম্পন্ন কর্মকর্তাদের অব্যাহত আধিপত্য।

নির্বাচনকে সামনে রেখে পতিত স্বৈরাচারী ব্যবস্থার প্রতি অনুগত আমলা, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসকরা একটি অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হতে পারেন। এ কারণে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কার্যকর প্রশাসনিক রদবদল করতে হবে। কেবল লোক দেখানো বদলি সুফল বয়ে আনবে না। সেক্ষেত্রে যে সকল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক পক্ষপাত দুর্নীতি বা নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রযন্ত্র ভোটারদের সেবা প্রদানের জন্য কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, এ কথাটা মনে রাখতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের ভূমিকা ঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নির্বাচনকালিন সময়ে নিরাপত্তা কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও নিরপেক্ষ কমান্ড কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করতে হবে। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় জনমনে ভয়-ভীতির আশঙ্কা আরো বেড়েছে। মব- সন্ত্রাস বা ভয়-ভীতি সহিংসতা কোন নির্বাচনই সুস্থ ও নিরপেক্ষ হতে পারে না। অনৈতিক কর্মকান্ড ঠেকাতে অন্তবর্তী কালীন সরকারকে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করতে গোয়েন্দা বাহিনী কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে নামানো যেতে পারে। এমন আস্থা তৈরি করতে হবে যে – আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়।

নির্বাচনকালীন ঝুঁকির মানচিত্র প্রণায়ন আবশ্যক ঃ বাংলাদেশের রেড জোন হিসাবে চিহ্নিত যে সকল জেলা বা থানায় অতীতে নির্বাচন পক্ষপাতিত্বের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে সেখানে বিশেষ তদারকি ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক পুনর্ববিন্যাস করা যেতে পারে। এতে করে প্রশাসনের ভিতর একটা সতর্কতার সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের সাথে পরামর্শ করে একটি” নির্বাচনী ঝুঁকি মানচিত্র “তৈরি করা যেতে পারে । এতে করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা কারচুপি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তাছাড়া সে এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের পক্ষপাতিত্ব থেকে দূরে রাখতে হবে ঃ গণমাধ্যমকে প্রশ্নাতীত ভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী দল গুলোকে সমানভাবে কভারেজ দিতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্রকাশ্যে পক্ষপাত, বিভ্রান্তিমূলক মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে কিনা তা নজরদারিতে রাখতে হবে। শুধু গণমাধ্যম ও সরকার নয় সচেতন নাগরিক সমাজকে ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে। ব্যয় ও কালো টাকা কঠিন নজরদারিতে রাখতে হবে।

দলীয় পরিচয় বিধিমালা লঙ্ঘনের শাস্তির বিধান রাখতে হবে। নির্বাচনে হেরে গেলেও প্রার্থী ও তার সমর্থকদের ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে।

নির্বাচনী আদালত গঠন আবশ্যক ঃ ডিজিটাল অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল মনিটরিং টিমের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিক ও প্রার্থীরা নিরাপদে তাদের অভিযোগ জানাতে পারবে। এসব অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। অস্থায়ী মোবাইল কোড পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচনকালীন “বিশেষ আদালত “গঠন করা যেতে পারে, সেখানে দ্রুত বিচার ও শাস্তির বিধান থাকতে হবে । ভোট কেন্দ্র দখল, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো বা অর্থের বিনিময়ে ভোট ক্রয় করার অভিযোগ পাওয়া গেলে নির্বাচনী আদালতে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করলে তা নির্বাচনকে প্রভাব মুক্ত রাখবে। এ সকল কর্মকান্ড পরিচালনায় ব্যর্থ হলে দিমুখী চাপ আরো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে। নির্বাচন হয়ে দাঁড়াবে প্রশ্নবিদ্ধ! তাই বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্র রক্ষায় ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তী কালীন সরকারকেই ইস্পাত কঠিন ভূমিকা রাখতে হবে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com